আমার দেখা কাশ্মীর - ১

প্রথম দেখা কাশ্মীর।

আমি ও আমাদের অফিসের কলিগ সুদেবদা এবারে ঠিক করলাম কাশ্মীর যাব। মার্চ মাসে মেয়ের পরীক্ষা শেষ, কাজেই ঠিক করলাম মার্চে মেয়ের পরীক্ষা শেষ হবার পর যাওয়া যাবে। আমাদের অফিসের কলিগ ও তাদের পরিবার বৃন্দ মিলে আমাদের দলে এবার মোট ২৭ জন, চার মাস আগেই সবার ট্রেনের টিকিট বুকিং করা হয়ে গেছেহোটেল বুকিং, গাড়ি বুকিং সব পাকা। কিন্তু যাবার ঠিক এক মাস আগে ঘটে যায় একটি ঘটনা১৩ ডিসেম্বর, ২০০১ সালে ভারতের সংবিধান আক্রমনের মূল আসামি , আফজাল গুরুর মামলায় নিম্ন ও দিল্লী আদালত যে ফাঁসির রায় দিয়েছিল, 8 আগস্টের, ২০০৫ সালের রায়ে সুপ্রীম কোর্ট তা বহাল রাখে। অবশেষে ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ সালের সকাল ৮ টায় আফজাল গুরুকে দিল্লীর তিহার জেলে ফাঁসি দেওয়া হয়। আফজালের মৃতদেহ কাশ্মীরে ফেরত গেলে সেখানে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হতে পারে সেই আশঙ্কায় তিহার জেলেই আফজাল গুরুর মৃতদেহ সমাহিত করার নির্ণয় নেন, দিল্লীতে তদানীন্তন মনমোহন সিংহের কংগ্রেস সরকার , রাষ্ট্রপতি ছিলেন আমাদের বাংলার প্রণব মুখার্জী।  কাশ্মীরে শুরু হয় এই ঘটনার এক ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবুও সেই অশান্তির মধ্যেই সাহস করে ১২ই মার্চ , ২০১৩,   জম্মুতবি এক্সপ্রেসে বেড়িয়ে পড়ি কাশ্মীর যাত্রায়১৩ ই মার্চ সকাল, তখনো ট্রেনে, খবর পাই, শ্রীনগরে দু'জন সন্ত্রাসবাদী, ক্রিকেট খেলোয়াড়ের পোশাকে সিআরপিএফ ক্যাম্পে অবস্থিত পুলিশ পাবলিক স্কুলের মাঠে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালায়, যার ফলে পাঁচ সিআরপিএফের জওয়ান নিহত হয় এবং আরো চার নাগরিকসহ দশ জন আহত হয়। হামলাকারীদের পিছু করার সময় জওয়ানদের গাড়ি স্থানীয় লোকেরা ঘিরে ফেলে ও পাথর ছুড়তে থাকে। সেই সময়ে জওয়ানদের গুলিতে দুই স্থানীয় লোকের মৃত্যু হয় এবং তারপর অনিশ্চিতকালীন কারফিউ ঘোষণা করা হয়।

ট্রেনে যখন এ খবর শুনলাম বুঝতে পারলাম এক্ষুনি কাশ্মীরের দিকে আর এগানো যাবে না। আমাদের সফর সূচিতে প্রথম রাত্রীবাস ছিল পটনীটপ, জম্মু ও শ্রীনগরের মাঝে সুন্দর এক শৈলস্থান পটনীটপ, তারপর  শ্রীনগর ও পহেলগম এবং শেষে মাতা বৈষ্ণদেবী দর্শন, কাটরা শহরে।  সুদেবদাকে প্রস্তাব দিলাম, জম্মুতে পৌছে প্রথেমে পটনীটপ না গিয়ে প্রথমে কাটরা যেতে, তারপর না হয় অবস্থা বুঝে শ্রীনগরের দিকে রওনা দেওয়া যাবে, তাতে হাতে দুদিন সময় পাওয়া যাবে, আশা করা যায় কারফিউ শিথিল হবে। সুদেবদা আমার থেকে বয়সে বড় ও অভিজ্ঞ লোক, সুদেবদা বললেন, না প্রথমে পটনীটপ তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থাযাওয়া হল পটনীটপ। 

 




পটনীটপ পৌছে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হল যে কাশ্মীরের দিকে এগানো সেই মূহুর্তে একেবারেই সম্ভব নয়। পটনীটপে জানতে পারলাম , জম্মু থেকে যে পর্যটকদের ট্রেনে ফিরে যাবার টিকিট বুকিং করা ছিল, শ্রীনগর থেকে তাদের ফেরার পথে গাড়ী লক্ষ করে ইট ছুড়ছে স্থানিয় লোকেরা, রাতের অন্ধকারে পর্যটকেরা শ্রীনগর থেকে কোনও রকমে ফিরে আসছেন জম্মু লক্ষ করলাম কয়েকটা ফিরতি গাড়ীর কাঁচ ভাঙ্গা , তাদের মুখে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারলামকাজেই আপাতত পিছু হটা ছেড়ে উপায় নেই১৫ ই মার্চ, পটনীটপ থেকে ফিরে এলাম কাটরা, তখন সন্ধে সাতটা, রাত্রি দশটায় যাত্রা শুরু করলাম মাতার মন্দিরের উদ্দেশে, ১২ কিমি খাড়াই পথ হেঁটে, প্রায় ৯০০০ ফিট উচ্চতা অতিক্রম করে মন্দিরে যখন পৌছালাম তখন ভোর ৬ টা

 

মাতারানির দর্শন করে , ২ ঘণ্টা বিশ্রাম নেবার পর ফেরার পথে দেখলাম ব্যাটারি চালিত কিছু ভ্যান গাড়ি রয়েছে, প্রায় পাঁচ কিমি নিচে পৌছে দেবে অর্ধকুয়ারী পর্যন্ত। দিনের বেলাতে এই ব্যাটারি চালিত ভ্যান গাড়ি গুলোকে দেখাতে পেলাম, কাল রাতে যখন ওপরে উঠছিলাম তখন এদের দেখা পাইনিব্যাটারি চালিত ভ্যান গাড়িতে পাঁচ কিমি পথ অতিক্রম করার পর আবার নিচে হাঁটা পথে সাত কিমিহোটেলে পৌছালাম প্রায় রাত আটটা, রাত্রির খাবার খেয়ে এক ঘুম দিয়ে উঠে পড়লাম ভোর ছটায়। এর মধ্যে শ্রীনগর ও কাশ্মীরের অনান্য অঞ্চলে কুরফিউ শিথিল হয়েছে, গাড়ি যাচ্ছে শ্রীনগর পর্যন্ত , ১৭ ই মার্চ সকল সাতটা নাগাদ জয় মাতাদি বলে রওনা হলাম শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে।

 






রাত আটটায় পৌছালাম শ্রীনগর শহরেপরের দিন অর্থাত্‍, ১৮ ই মার্চ, শ্রীনগরের প্রসিদ্ধ ডাল লেকে ঘুরে বেড়ানো হল। বিখ্যাত নিষাদ বাগ সহ শহরের আরো কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখে নেওয়া গেল। 

 







ভোরেই খবরের কাগজেই দেখতে পেয়েছিলাম, ২০ মার্চ , কাশ্মীর বনধ জানতে পারলাম সন্ত্রাসবাদীদের  শ্রীনগর শহর ও তার আশেপাশের সন্ত্রাসবাদী এলাকায় প্রভাব বেশী , গুলমার্গে সেরকম ঝামেলা নেই। কাজেই ২০ ই মার্চ, অশান্তি এড়াতে ভোর বেলায় সূর্যের আলো ফোটার আগেই রওনা দিলাম গুলমার্গ, ফিরে এলাম বিকেলে। 










পরের দিন বনধ
, তাই শ্রীনগরে বসে থেকে কোনও লাভ নেই, পুরোনো সফর সূচী বদলে, ভোর তিনটেতে রাতের অন্ধকারে শ্রীনগর ছেড়ে এক বুক আতঙ্ক নিয়ে রওনা হলাম পহেলগাম। দেখা হল না সোনামার্গ। পহেলগামে, বেতাব ভ্যালি ও আরু ভ্যালি দেখে ২১ মার্চ ফিরে এলাম জম্মু।











 তারপর ২২ মার্চ জম্মু থেকে রওনা হয়ে ২৩ মার্চ কলকাতায় ফেরত। দেখা হল কিছু
, বাকি রয়ে গেল অনেক কিছুই।

 



Comments

Popular posts from this blog

আমার দেখা কাশ্মীরঃ জয় মাতাদির মন্দির