আমার দেখা কাশ্মীরঃ জয় মাতাদির মন্দির
জয় মাতাদির মন্দির
গত রাতে শ্রীনগর থেকে কাটরা শহরে প্রবেশ করে হোটেলে চেক-ইন করতে রাত প্রায় ন’টা হয়ে গেল। মন্দিরে প্রবেশ করতে যে রেজিস্ট্রেশন স্লিপ দরকার তা যে কাউন্টার থেকে বিতরণ করা হয় তা রাত দশটায় বন্ধ হয়ে যায়, ফলে হাতে খুব একটা সময় না থাকায় ও সফরজনিত ক্লান্তির কারণে রাতে বৈষ্ণব দেবী মাতার যাত্রার যে পূর্বপরিকল্পনা ছিল তা বাতিল করতে হল। সবাই মিলে ঠিক করলাম একটু বিশ্রাম নিয়ে ভোর চারটায় হোটেল থেকে রওনা হব।
এখানে একটা কথা বলে রাখি , যদিও অপ্রাসঙ্গিক , তবুও বলি , আজ আমার নিজের বড়দির কথা বড়ো মনে পড়ছে। গতবার আমাদের সাথেই ছিল কাশ্মীর ভ্রমণে, কিছুতেই আসতে চাইছিলনা। বহু অনুরোধ–উপরোধে আসতে রাজি হয়েছিল । বছর দেড় আগেই জামাইবাবু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, স্বাভাবিকভাবেই দিদির মানসিক অবস্থা ছিল ভারাক্রান্ত, আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। শর্ত রেখেছিল তাঁকে যেন কোথায় যাবার জন্য জোর না করা হয়। সারা কাশ্মীর আমাদের বাসে আমার পাশের সিটে বসেছিল। বৈষ্ণবদেবী মাতার দর্শনে যাবার দিন অনুমান করেছিলাম হয়তো দেবীর মন্দিরে যাবার দীর্ঘ পথের কথা মাথায় রেখে দলের কিছু বয়স্ক সদস্য হোটেলেই থেকে যাবেন, কিন্তু সেরকমটি হল না, সবাই যাবেন মাতাদির দর্শনে।
দিদিকে বললাম “তোকে একাই থাকতে হবে হোটেলে , আমি ফিরে আসা না পর্যন্ত দরজা খুলবি না হোটেলের রুমের” ।
হঠাৎই দিদি বলে উঠল,
“যাবো কিনা বুঝতে পারছি না, পথে শরীর খারাপ হলে তোদের যদি অসুবিধা হয়’ ।
অভয় দিলাম ,
“ধীরে-সুস্থে যাবো” ।
দিদিকে নিয়ে আমরা সবাই রয়না হলাম রাত দশটায়। আর ভোর ছটায় যখন মাতার দরবারে পৌঁছলাম, মহিলাদের মধ্যে দিদি ছিল সবার আগে। শুনেছিলাম মাতার বুলাওয়া (মায়ের ডাক) না এলে মাতার নাকি দর্শন হয় না , মনে হয় দিদির কাছে মাতার বুলাওয়া এসেছিল।
এবার তাই রওনা হবার সময় দিদির কথা বড় মনে পড়ছিল। ভোর চারটায় হোটেল থেকে আমাদের দলের দিশারী ও তার বাবা-মা , আমি - আমার মেয়ে ও আমার স্ত্রী, সুদীপ – তার স্ত্রী, ছেলে ও তার ভাগ্নে, সোমক দাস মহাশয় ও তাঁর স্ত্রী এবং বোসদা এই মোট ১৩ জনের দল রওনা হলাম হোটেল থেকে। ভাগ্নে “বাবী” হোটেলেই রয়ে গেল, মন্দিরে তার অরুচি। যেহেতু মাতার মন্দির সারা রাত খোলা তাই লোকজন বা যানবাহনের কোনও ঘাটতি নেই পথে। হোটেল থেকে অল্প দূরত্ব, কিছু সময়েই অটোতে পৌঁছে গেলাম রেজিস্ট্রেশন কাউন্টারে। কাটরা বাস স্ট্যান্ডের কাছেই রেজিস্ট্রেশন কাউন্টারটি (YRC)।
উল্লেখ্য রেজিস্ট্রেশনের কাজটি “শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী শ্রাইন বোর্ড” কৃতকই সম্পন্ন হয়। অন্য কোন সংস্থা, বেসরকারী বা সরকারী যাত্রা রেজিস্ট্রেশনের স্লিপ ইস্যু করার জন্য অনুমোদিত নয়। রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং কম্পিউটারাইজড। প্রতিটি যাত্রীকে তার নাম, প্রাথমিক তথ্য রেজিস্ট্রিভুক্ত করার পরে সেখানেই ছবি তোলা হয় এবং তাকে একটি RFID যাত্রা অ্যাক্সেস কার্ড দেওয়া হয় যা মূল মন্দিরে যাত্রা করার জন্য ডকুমেন্টারি অনুমতি। যাত্রীকে আরএফআইডি কার্ড ইস্যু করার ৬ ঘন্টার মধ্যে বানগঙ্গায় অবস্থিত প্রথম চেকপোস্ট, যা YRC থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার, অতিক্রম করতে হবে। তা না করতে পারলে চেক পোস্টে থেকে তাকে ফিরে গিয়ে আবার নতুন করে যাত্রা স্লিপ ইস্যু করাতে হবে। এই রেজিস্ট্রেশনের স্লিপ অনলাইনও ইস্যু করা যায়।
(ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
যাক রেজিস্ট্রেশনের স্লিপ ইস্যু করতে খুব একটা সময় লাগলো না। রওনা হলাম বানগঙ্গার উদ্দেশ্যে। রাস্তায় প্রচুর লোক, পথ চলাই দা । একটা কথা বলে রাখি বানগঙ্গা যাবার পথে রাস্তার দুই পাশে লাঠি পাওয়া যায়, ১০-২০ টাকা ভাড়ায়, দর্শন শেষে ফিরে এসে লাঠি ফেরত দিলে অর্ধেক মূল্য ফেরত পাওয়া যায়। গতবার দেখলাম সবাই কিনছে তাই দেখে আমিও একটা কিনে নিয়েছিলাম, দর্শন শেষে লাঠি ফিরিয়ে না দিয়ে,স্মৃতি হিসাবে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। এই লাঠি কিন্তু মাতার মন্দিরে যাবার পাহাড়ি পথে বেশ কাজে এসেছিলো, লাঠিতে ভড় দিয়ে পাহাড়ি পথে ওঠা এবং নাম দুই অনেক সহজ হয়ে গেছিল।
কিছু সময়ের মধ্যেই বানগঙ্গা চেকপোস্টে পৌঁছে গেলাম এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। কড়া সুরক্ষা চেকিং। তারপরই ছেঁকে ধরল ঘোড়া ও পালকিওয়ালাদের দল। মোটামুটি ১২০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকার মধ্যে ঘোড়া/পিঠু/পালকি ভাড়া পাওয়া যায়। ২০০২ সালে কাটরা থেকে হেলিকপ্টার পরিষেবা শুরু হয় সাঁঝিছাত পর্যন্ত। সাঁঝিছাত থেকে মাতার গুহামন্দির প্রায় আড়াই কিলোমিটার।
“দর্শনী দেওঢ়ি” বা “দর্শনী দরওয়াজা” (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
বানগঙ্গার এই প্রধান প্রবেশ পথটি “দর্শনী দেওঢ়ি” বা “দর্শনী দরওয়াজা” নামে খ্যাত। জনশ্রুতি আছে যে মাতা বৈষ্ণো দেবী এখানে পন্ডিত শ্রীধরের সাথে মেয়ে রূপে দেখা করেছিলেন। এটিকে দর্শনী দরওয়াজাও বলা হয় কারণ এখান থেকে ত্রিকুটা পর্বতের সম্পূর্ণ দৃশ্য দেখা যায়।
পায়ে হাঁটার জন্যে সুন্দর করে পাথর বাঁধানো পথ, আঁকাবাঁকা ঘোরানো পথ উঠে গেছে ত্রিকুটা (অর্থাৎ তিনটি চূড়া) পাহাড়ের ওপরে মাতার পবিত্র গুহার দিকে। বানগঙ্গা চেকপোস্ট থেকে খাঁড়াই পথ ধরে ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে দু’হাজার’সাতশো ফুট উচ্চতায় (বানগঙ্গা চেকপোস্ট থেকে) পৌঁছালে তবে মাতার পবিত্র গুহা। সোমক দাস মহাশয় বয়স জনিত কারণে ওপরে উঠলেন না, নীচেই রয়ে গেলেন, হোটেলে ফিরে যাবেন। আমরা হাঁটাপথই ধরলাম। গতবারও হাঁটাপথই ধরেছিলাম, যদিও সেইবার যাত্রা শুরু করেছিলাম রাতের বেলায়। পথ বানগঙ্গা চেক্পোস্ট থেকে ডানহাতে মোড় নিলো, প্রায় এক কিলোমিটার চলার পর একটি ছোট্ট সেতুতে পৌঁছানো গেল, নীচে বানগঙ্গা প্রবাহিত হচ্ছে। মাতার অলৌকিক ঘটনার কিংবদন্তি এই পবিত্র প্রস্রবণের সাথে জড়িত। অনেক ভক্ত যাত্রা শুরু করার আগে এই নদীতে স্নান করে নিচ্ছে। কয়েকটি ঘাটও নির্মাণ করা হয়েছে এই উদ্দেশ্যে। 'বান' এবং 'গঙ্গা' দুটি শব্দের সংযোজনায় প্রস্রবণের নাম। বিশ্বাস করা হয় যে মাতা বৈষ্ণোদেবীর তীরের আঘাতে এই প্রস্রবণ তৈরি হয়েছিল, এও বিশ্বাস করা হয় যে মাতা এই প্রস্রবণে ডুব দিয়ে তাঁর চুল ভিজিয়ে ছিলেন, তাই এই প্রস্রবণকে বাল গঙ্গাও বলা হয়।
বানগঙ্গা (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
পাকানো পথ ধরে উপরে উঠেতে শুরু করলাম, একটু ওপরে উঠি আর ওপরের দিকে দেখি, আর কত পথ বাকি? এভাবে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর প্রায় ন’শ ফুট উচ্চতায় পৌঁছাবার পর এলো এক মন্দির। চরণ পাদুকা – বিশ্বাস করা হয় এখানে একটি সমতল পাথরে যে পদচিহ্ন আছে তা মায়ের পবিত্র পায়ের চিহ্ন। শ্রাইন বোর্ড দ্বারা পরিচালিত একটি মেডিকেল ইউনিটও আছে এখানে। এতটা পথ চলার পর ক্লান্ত লাগছিল একটু বসলাম বিশ্রাম নিতে।
চরণ পাদুকা (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
কিছুক্ষন বিশ্রাম নেবার পর শুরু হল আবার পথ চলা। ততক্ষণে সূর্যদেবতা নিজের প্রকাশ ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছন চতুর্দিকে। চারিদিকের পথশোভা বড়ই মনোরম হয়ে উঠেছে। যদিও ত্রিকূটা পাহাড় রুক্ষ, তাও যতটুকু সবুজ আছে তাই পথের শোভা বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট। দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গাঁ বেয়ে গুহামন্দিরে যাবার সর্পিল পথ কেমন ক্রমাগত উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে। মরিয়া চেষ্টা করে যাচ্ছি পথের শেষ দেখার, কিন্তু বিফল হচ্ছি। রাতে এই পথ দেখতে লাগে বড় সুন্দর, যদিও পার্শ্ববর্তী প্রকৃতির শোভা দেখা যায় না, তবুও ঘন কালো অন্ধকারে এই সর্পিল পথের পাশের প্রতিভাত আলোগুলো তৈরি করে এক আলোপথ, দেয় এক পথনির্দেশ। লাঠিটাকে পেছনের দিকে ঠেলা দিতে দিতে উঠে যাচ্ছি ওপরের দিকে। আমদের সাথে পথ চলছে অনেক ভক্তজন, কেউ ঘোড়ায়, কেউ পাল্কি আবার কেউ পিঠুতে। মাঝে মাঝেই তাদের সমবেত ধ্বনি হৃদয়ে সঞ্চার করছে এই দীর্ঘ পথ চলার শক্তি।
জোর সে বোলো জয় মাতা দি
সারে বোলো জয় মাতা দি
হাম ভি বোলে জয় মাতা দি
তুম ভি বোলো জয় মাতা দি
আগে বোলো জয় মাতা দি
পিছে বোলো জয় মাতা দি
মিল্কে বোলো জয় মাতা দি
এইভাবেই উঠে পড়লাম আরও সাড়েতিন
কিলোমিটার, অর্থাৎ বানগঙ্গা চেকপোস্ট থেকে মোট ছয়
কিলোমিটার, আর উচ্চতা ২৩০০ ফুট, পৌঁছলাম অদ্ধকুআরি বা অর্ধকুআরি।
তার মানে আমারা এখন মাঝ পথে, মাতার গুহায় পৌঁছাতে আরো ছয় কিলোমিটারের পথ বাকি। বিশ্বাস করা হয় যে অদ্ধকুআরি শব্দটি আদিকুয়ারি
শব্দ থেকে সৃষ্টি হয়েছে যার অর্থ অসীম কুমারী। কিংবদন্তি অনুসারে, পণ্ডিত শ্রীধরের আয়োজিত ভাণ্ডারার (সর্বজনীন
ভোজ) থেকে বৈষ্ণবী একটি ছোট মেয়ের রূপে অদৃশ্য হয়ে
প্রথমে বানগঙ্গা ও পরে চরণ পাদুকায় বিশ্রাম নেন তারপর তিনি তিনি অদ্ধকুআরিতে
পৌঁছান। যেখানে একটি ছোট গুহায় তিনি গর্ভের আকারে একটি ছোট্ট কোটরে ন’য় মাস ধ্যান করেন। বৈষ্ণবী এই গর্ভ আকৃতির গুহায় ন’য় মাস ধরে সাধনা করেছিলেন বলে এই গুহাটি গর্ভজুনা নামে খ্যাত। ধ্যানের
মাঝখানে যখন মাতা বুঝতে পারলেন যে ভৈঁরোনাথ তার সন্ধানে গুহায় এসে পৌঁছেছেন, তখন তিনি ত্রিশূল দিয়ে গুহার অপর প্রান্তে একটি পথ তৈরি করে পবিত্র গুহার
দিকে চলে যান।
অদ্ধকুআরি চরণ পাদুকা (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
অদ্ধকুআরি থেকে দুইদিকে দুটি পথ বিভক্ত হয়ে দুটিই চলে গেছে গুহামন্দিরের দিকে। একটি পথ পুরনো পথ, হাতি মাত্থা ও সাঁঝিছাত হয়ে চলে গেছে গুহামন্দিরের দিকে, নতুন পথও গেছে গুহামন্দিরের দিকেই, তবে এর চড়াই পুরনো রাস্তা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ও দূরত্বও আধকিলোমিটার কম। জানতে পারলাম অদ্ধকুআরি গুহাটি খুবই আঁটসাঁট এবং একবারে মাত্র একজন মানুষ এর মধ্য দিয়ে যেতে পারে। তাই অদ্ধকুআরি গুহা দর্শন না করে নতুন পথে ধরে মাতার পবিত্র গুহামন্দিরের দিকে এগিয়ে চললাম।
আবার সেই পথ চলা, পথের পাশেই বসার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা আছে, মাঝে মধ্যেই সেই চেয়ারে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। প্রতিদিন হাজারের ওপর ভক্ত দেবীর দর্শনে আসেন, এই সংখ্যা নবরাত্রি উদযাপনের সময়ে প্রতিদিন ছাড়িয়ে যায় ত্রিশ হাজারেরও বেশী। সারা ভারতবর্ষেই, বিশেষ করে এই অঞ্চলের জনসাধারণের কাছে মাতা বৈষ্ণবদেবী খুবই জাগ্রত দেবী বলে বিবেচ্য। মানুষের মনস্কামনা পূর্ণ করেন দেবী এরকমই আস্থা মাতার ওপর। এই আস্থা, এই বিশ্বাস মনে নিয়ে কত ধরণের ভক্ত দর্শনে আসেন। নিজের চোখেই দেখেছি, কত মাতাকে তাঁর সন্তান কোলে নিয়ে, ছেলে তাঁর বৃদ্ধ বাবাকে কাঁধে নিয়ে, কত মহিলা তাঁদের ছোট্ট শিশুকে ঘোড়ায় বসিয়ে , কত বৃদ্ধা পাল্কিতে , কত পঙ্গু লাঠিতে ভর দিয়ে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে চলেছে। কথায় আছে “Rumour has some element of truth in it” অর্থাৎ “যা রটে তার কিছু তো বটে”, কাজেই যদি মানুষের এই মনস্কামনা পূর্ণ হবার কথা সত্য না হত তাহলে সারা বত্সরে কি পঞ্চাশ লক্ষেরও অধিক ভক্ত এত কষ্ট নিয়ে এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর পথ অতিক্রম করত?
![]() |
| ভক্ত |
![]() |
| ভক্ত |
![]() |
| ভক্ত |
![]() |
| ভক্ত |
![]() |
| ভক্ত |
![]() |
| ভক্ত |
![]() |
| ভক্ত |
আবার হাটতে শুরু করলাম , পথ আর শেষ হয় না , তখন মনে বেজে চলে সেই কথা, পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো, বলো কবে শীতল হবো, কত দূর আর কত দূর বল মা। ক্লান্ত চরণ টানতে টানতে এই ভাবে আরও পাঁচ কিলোমিটার পথ চলার পর দূর থেকে দেখা পেলাম ভক্ত। মন হয়ে উঠল উতলা, পায়ের শক্তির সঞ্চার হল হঠাত, দ্রুত গতিতে অগ্রসর হতে থাকলাম মায়ের গুহামন্দিরের দিকে। যখন গুহামন্দিরের ভবনের চত্বরে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে বাজে ঠিক সকাল ১০:৩৫।
![]() |
| মায়ের গুহামদিরের ভবন |
গুহামন্দিরের ভবনের চত্বরে ঢোকার মুখে আর এক প্রস্থ সুরক্ষা চেকিং। ক্যামেরা মোবাইল, ব্যাগ প্রবেশ নিষিদ্ধ। টাকা পয়সা, গয়নাগাটি বাদ দিয়ে প্রায় সবকিছুই নিষিদ্ধ। ভবনে ঢোকার মুখেই “ শ্রী মাতা বৈষ্ণব দেবী শ্রাইন বোর্ড” এর ক্লোক রুমে সমস্ত জিনিসপত্র একটি লকারে জমা রেখে দিলাম। গতবার ক্যামেরা এনেছিলাম, এবার আর নিয়ে আসিনি, তবে মোবাইল অবশ্যই নিয়ে এসেছিলাম। একটা কথা বলে রাখি , এই পথে যাত্রার সময় মোবাইল অবশ্যই সঙ্গে রাখা উচিত, কারণ দলছুট হয়ে যাবার সম্ভবনা প্রচুর, তখন মোবাইল না থাকলে যোগাযোগ করা হয়ে উঠবে খুবই দুরূহ। আর হ্যাঁ, লকার নম্বর অবশ্যই মনে রাখতে হবে, লকার নম্বর ভুলে গেলে জিনিসপত্র ফেরত্ নেবার সময় অসুবিধায় পড়তে হবে।
![]() |
| ক্লোক রুম |
উল্লেখ্য ভবনের সামনেই রয়েছে শ্রাইন বোর্ডের পুজোর সামগ্রীর দোকান, তাই কাটরা থেকে পুজোর সামগ্রী কিনে তারপরে সেগুলিকে ভবন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই। পুজোর নৈবেদ্য - লাল চুনরি, শাড়ি, ছোলা, রুপা বা সোনার গয়না, শুকনো ফল, ফুল অনুমোদিত, প্রসাদে ফুল্লিয়া (খই), মাখনা, চুন্নি, মৌলি (লাল সুতো), নারকেল, আতর, চুড়ি ও সিঁদুর। এই সবই একটি পাটের তৈরি ব্যাগে শ্রাইন বোর্ডের পুজোর সামগ্রীর দোকান থেকে পাওয়া যায়। মিষ্টি, মিষ্টি জাতীয় খাবার ইত্যাদি গুহায় গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। নিরাপত্তার কারণে নারকেলও গুহায় নিয়ে যাবার অনুমতি নেই কিন্তু যেহেতু নৈবেদ্য নারকেলের গুরুত্ব আছে তাই গুহায় প্রবেশের আগে ভক্তদের মূল ওয়েটিং হলের কাউন্টারে নারকেল জমা দিতে হয়, বিনিময়ে একটি টোকেন পাওয়া যায়। দর্শন করে পবিত্র গুহা থেকে বের হবার পর আলাদা প্রসাদ কাউন্টারে টোকেন দিয়ে নারকেল ফেরত পাওয়া যায়।
![]() |
| শ্রাইন বোর্ডের পুজোর সামগ্রীর দোকান |
শ্রাইন বোর্ডের পুজোর সামগ্রীর দোকান থকে পুজোর সামগ্রী কিনে চললাম মাতার দর্শনে, পুরনো গুহার মুল প্রবেশ পথ সঙ্কীর্ণ, এত লোকের সেই সঙ্কীর্ণ পথ দিয়ে দর্শন করা সম্ভব নয়, তাই দুটি নতুন টানেল দিয়ে মাতার দর্শনের জন্যে দুটি নতুন পথ করা হয়েছে। দর্শনের জন্য লাইন দিলাম সেই টানেলের মুখে, লাইন ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল, পর্বতের থেকে নির্গত হিমশীতল জলধারা পায়ের তলায় প্রবাহিত হচ্ছে, ক্রমে এলো সেই চরম মুহূর্ত, যার জন্যে এত কষ্ট সহ্য করে, এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা, দর্শন হল মাতার ।
মাতা পবিত্র গুহায়, একটি প্রাকৃতিক শিলায় তিনিটি পিণ্ড রূপে বিরাজিত এবং এই পিণ্ডই মাতৃদেবীর প্রতীক হিসাবে পূজিত হয়। সম্পূর্ণ শিলাটি জলে নিমজ্জিত এবং এর চতুষ্পার্শ্ব মার্বেল দিয়ে বেষ্টিত। মূল দর্শন তিনটি পবিত্র পিণ্ডরই। এই পবিত্র পিন্ডগুলির বিশেষত্ব হল তিনটি পিন্ড একই শিলা দিয়ে তৈরি হলেও প্রতিটি পিন্ডের রঙ ও রূপ ভিন্ন । ডানদিকে পিণ্ড মহাকালীর কালো রঙের। মহালক্ষ্মী মাঝখানে, মাতা মহালক্ষ্মীর পীতাম্বর-হালকা লাল রঙের পিন্ড এবং বা দিকের সাদা রঙের পিন্ড মাতা মহাসরস্বতী রূপে পূজিত হয়। উল্লেখ্য যে পবিত্র গুহার ভিতরে, মাতার রূপ পাথরে তৈরি প্রাকৃতিক রূপ পিন্ডেই দেখা হয়, ভিতরে কোন মূর্তি, প্রতিমা বা ছবি নেই। পবিত্র গুহায় তিনটি পিন্ডর দর্শনই মূল দর্শন।
![]() |
| গুহায় ঢোকার পুরনো পথ |
![]() |
| গুহায় ঢোকার নতুন পথ |
![]() |
| মাতা পবিত্র গুহায়, একটি প্রাকৃতিক শিলায় তিনিটি পিণ্ড রূপে বিরাজিত । মহালক্ষ্মী মাঝখানে, মাতা মহালক্ষ্মীর পীতাম্বর-হালকা লাল রঙের পিন্ড এবং বা দিকের সাদা রঙের পিন্ড মাতা মহাসরস্বতী রূপে পূজিত হয়। |
এবার ফেরার পালা, ঘুরে দেখছিলাম ভবন চত্বর। ভক্তদের সুবিধার্থে শ্রাইন বোর্ডের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা করা হয়েছে। রেস্টুরেন্ট, থাকার ব্যবস্থা, টয়লেট, পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্ক, যোগাযোগ সুবিধা, ঘোষণা কেন্দ্র, কম্বল স্টোর, লাগেজ রাখার জন্য ক্লোক রুম, চিকিৎসা কেন্দ্র (আইসিইউ সুবিধা সহ), জেনারেল স্টোর, উপহারের দোকান, থানা ইত্যাদি সবই বিদ্যমান ভবন চত্বরে। মাতার এই গুহামন্দিরের ওপরেও পথ চলে গেছে ভৈরোঘাঁটি দিকে, যেখানে রয়েছে ভৈঁরনাথের মন্দির। বানগঙ্গা, চরণপাদুকা ও আধকুয়ারীর পর অবশেষে দেবী পবিত্র গুহা মন্দিরে পৌঁছান। দ্বন্দ্ব এড়ানোর অনেক চেষ্টা করার পরেও ভৈঁরোনাথ যখন দেবীর পশ্চাদ্ধাবন থেকে বিরত হলেন না, তখন দেবী তাকে হত্যা করতে বাধ্য হলেন। মাতা গুহার মুখের বাইরে , ভৈঁরোনাথের শিরশ্ছেদ করেন। ভৈরোনাথের মস্তক এক পর্বতের চূড়ায় গিয়ে পড়ল। মৃত্যুর সময় ভৈরোনাথ দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। ভৈরোনাথের প্রতি মার করুণার উদয় হল এবং তাকে তিনি বর দিলেন যে দেবীর প্রতিটি ভক্ত দেবীর দর্শন করার পর ভৈরোনাথের দর্শন করলেই যাত্রা সম্পূর্ণ হবে। ২০১৮ সালে মাতার ভবন থেকে ভৈরোনাথ পর্যন্ত রোপওয়ের চলাচল শুরু হয়েছে।
![]() |
| ভৈঁরনাথের মন্দির |
যেই পথে এসেছিলাম সেই পথ দিয়েই ফেরা , ব্যাটারি চালিত কিছু গাড়ি যাতায়াত করে অদ্ধকুআরি থেকে মাতার ভবন পর্যন্ত, গাড়িভাড়া যাবার সময় প্রায় ৩৫০ টাকা এবং ফেরত্ আসার সময় ২৫০ টাকা, কিন্তু তাদের দেখা মেলাই ভার। গতবার ফেরার সময় এই ব্যাটারি চালিত গাড়িতেই মাতার ভবন থেকে অদ্ধকুআরি পর্যন্ত গিয়েছিলাম , এবার তার দেখা মিললেও, সংখ্যায় এতই নগণ্য যে যায়গা পাওয়ার জন্যে লুঠ পড়ে গেল, কয়েকবার চেষ্টা করেও বিফল হলাম। অগ্যতা আবার হাঁটা পথ ধরলাম , দলের সবাই ঘোড়া ভাড়া করার প্রচেষ্টা শুরু করল। আমার কোমরে আঘাত থাকার কারণে , ঘোড়ায় চড়া নিষেধ , স্ত্রী ও কন্যা আমাকে হাঁটাপথে একা ছাড়তে নারাজ তাই তিনজনে পদব্রজেই ফেরার পথ ধরলাম, বেলা তখন প্রায় দু’টো। গতবার ফেরার পথে বেশ কিছু জায়গায় দেখেছিলাম কিছু স্থানীয় লোক ঢোল-ঢাক বাজিয়ে মাতাদির “জয়গান” গাইছে। এবারও তাই দেখলাম। বেশ সুন্দর লাগছিল তাঁদের গান শুনতে। দাঁড়িয়ে শুনলাম তাঁদের সুমধুর গান কিছুক্ষন, কিছু দক্ষিণাও দিলাম। আবার নামা। শ্রাইন বোর্ডের পক্ষ থেকে রাস্তার ব্যবস্থাপনা খুবই সুন্দর। সারা রাস্তা জুড়ে হাজারেও বেশি ভেপার ল্যাম্প লাগানো। পথে শ’খানেকেরও বেশি জায়গায় জলের ব্যবস্থা কিছু জায়গায় ওয়াটার কুলার লাগানো জায়গায়-জায়গায় টয়লেটের ব্যবস্থা। কাজেই রাস্তায় যাত্রাজনিত সেরকম অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি।
সেদিন ছিল একটি বিশেষ দিন যার ফলে প্রচুর ভক্তের সমাগম, দলে দলে ভক্তরা উঠে আসছে, একই পথে লাইন করে ঘোড়ার দল, ফলে নিচে নামতে প্রচন্ড অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। তাই পাশের সিঁড়ির পথ ধরলাম। বানগঙ্গা থেকে মাতার ভবন পর্যন্ত প্রায় সাড়েচারহাজারেরও বেশী সিঁড়ির ধাপ, এই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা মটেও সুবিবেচনাপ্রসুত নয় কারণ এতে শ্বাসকষ্টজনিত অসুবিধা হতে পারে।
২০১৮ সালে শুধুমাত্র পথচারীদের জন্যে “তারাকোট মার্গ” নামে আর একটি নতুন পথ শুরু করা হয়েছে, যা বানগঙ্গা চেকপোস্ট থেকে শুরু করে অদ্ধকুআরিতে এসে পূর্ববর্তী পথের সাথে মিলিত হয়। এই পথ সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এবং পূর্ববর্তী পথের থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘতর।
সিঁড়ি ধরে অনেকটা পথ নামার পর একটি সুন্দর শ্বেতপাথরে বাঁধানো জায়গায় দেখালাম বহুলোক বিশ্রাম নিচ্ছে, আমারাও বসে পড়লাম, সুন্দর মনোরম দৃশ্য, সূর্য হেলে পড়ছে পশ্চিমে, মৃদু বাতাস বইছে, ক্লান্ত শরীরে পরশ দিয়ে যাচ্ছে আরামের। হঠাৎ দেখা গেল দিশারী ঘোড়গুলোর মাঝে ছুটতে-ছুটতে নামছে। কি হলো? কি হলো? দিশারী, দিশারী ডাক দিয়ে থামানো হলে ওকে, জানতে পাড়লাম মাত্র দুটো ঘোড়াই পাওয়া যাচ্ছিল, দিশারী , ওঁর মা ও বাবাকে ঘোড়ায় চাপিয়ে নিজে ওদের সাথে ছুটতে ছুটতে নামছে যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পরে। যাক, ওঁকে আমাদের সাথে নিয়ে নিলাম, ওঁর মা ও বাবা ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে গেলো। আমরা দিশারীকে সঙ্গে নিয়ে আবার নামতে শুরু করলাম ।
কিছুদূর এসে দেখলাম বোসদা
দাড়িয়ে, বললাম এখানে কেন? বানগঙ্গা চেকপোস্টের কাছে দাঁড়াতে বলেছিলাম তো, বললেন ঘোড়ায়ালা এখানেই নিমিয়ে দিলো, কোনদিকে
যাব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
আরো কিছুদূর এগিয়ে বানগঙ্গার
কাছে দেখালাম, মিসেস দাস অর্থাৎ সোমক দাস মহাশয়ের স্ত্রী তিনিও
দাঁড়িয়ে, একই কথা কোনদিকে যাব বুঝে উঠতে পারছি না। যাক সবাই মিলে বানগঙ্গা চেকপোষ্টের বাইরে বেরিয়ে এলাম, কিন্তু দিশারীর মা ও বাবাকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো? তাঁরা তো ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে এসেছেন,
এতক্ষণেতো চলে আসার কথা। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর চিন্তা
হতে শুরু করল, ঘণ্টা খানেক কেটে গেলো, মোবাইলেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ঘোষণা করানো হল, তাও দেখা নেই, চেকিংপোষ্টের সুরক্ষা কর্মীদের থেকে বিশেষ
অনুমতি নিয়ে গেটের ভেতরে গিয়ে আবার সন্ধান করা গেল। দিশারীর মা ও বাবা গেটের ভেতরে আমাদের জন্যই
অপেক্ষা করছিলেন কিন্তু আমরা তাদের অলক্ষেই ওনাদের পেরিয়ে চলে এসেছি। যাক এবার
হোটেলে ফের যাক, কাল জুম্মু থেকে ট্রেন ধরে কোলকাতায় ফেরা “জয় মাতা দি” নাম নিয়ে “আমার দেখা কাশ্মীর” পর্ব
শেষ করলাম।
গুঞ্জন গুহ।
(সমাপ্ত)




.jpg)
















খুব সুন্দর লাগল কাশ্মীর পর্ব। পড়তে পড়তে মানসভ্রমণ হয়ে গেল। নতুন চোখে কাশ্মীরকে দেখলাম। ছবিগুলো খুব ভালো লাগল।
ReplyDelete